বাংলা ভাষার উৎপত্তি যেভাবে
যে ভাষা আমরা জন্মের পর থেকে শুনে আসছি, যে ভাষায় নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করে চলেছি- সেই প্রাণের ভাষা বাংলা এলো কোথা থেকে? কিভাবে এর উৎপত্তি? আসলে বাংলাভাষার উৎপত্তি নিয়ে নানা জনের আছে নানা মত। তবে এটা সত্য যে বাংলাভাষা একদিনে আজকের পর্যায়ে আসেনি। শত সহস্র বছরের বিবর্তনে এটি আজকের রূপ পেয়েছে। এখন আমরা যে বাংলা ভাষা বলি এক হাজার বছর আগে তা ঠিক এমন ছিল না। এক হাজার বছর পরও ঠিক এমন থাকবে না। ভাষা এমনই চলমান প্রক্রিয়া, পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এটি সমৃদ্ধ হয় এবং নতুন রূপে বিকশিত হয়।
এই ভূখন্ডে বাংলা ভাষার আগেও অন্য ভাষা ছিল। ওই ভাষায় এদেশের মানুষ কথা বলত, গান গাইত, কবিতা বানাত। মানুষের মুখে মুখে বদলে যায় ভাষার ধ্বনি। রূপ বদলে যায় শব্দের, বদল ঘটে অর্থের। অনেকদিন কেটে গেলে মনে হয় ভাষাটি একটি নতুন ভাষা হয়ে উঠেছে। আর এভাবেই রূপন্তরের মধ্যে দিয়ে উৎপত্তি হয়েছে বাংলাভাষার। তবে এ ধারণা ভেঙে দিয়েছেন ভাষাবিদ ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আর ড. মুহাম্মদ শহীদউল্লাহসহ আরও বেশ কজন গবেষক ভেঙে দিয়েছেন সেই ধারণা। গবেষণায় তারা প্রমাণ করেছেন, সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপত্তি ঘটেনি বাংলার। ঘটেছে অন্য কোনো ভাষা থেকে। সংস্কৃত ছিল সমাজের উঁচুশ্রেণির মানুষের লেখার ভাষা। তা কথ্য ছিল না। কথা বলত মানুষেরা নানা রকম ‘প্রাকৃত’ ভাষায়। প্রাকৃত ভাষা হচ্ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কথ্য ভাষা। তাঁরা প্রমাণ করেন যে, সংস্কৃত থেকে নয়, প্রাকৃত ভাষা থেকেই উদ্ভব ঘটেছে বাংলা ভাষার।
প্রাচীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে মনের ভাব প্রকাশের নানা রীতি চালু ছিল। সেখান থেকেই অঞ্চলভেদে উৎপত্তি হয় ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতভাষা। আমাদের এই নদী বিধৌত পূর্ব অঞ্চলের মানুষেরা যে প্রকৃত ভাষায় কথা বলতে, তা হলো মাগধী। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা মাগধি রূপান্তরিত হয়ে বাংলাভাষার উদ্ভব হয়।
বাংলা ভাষার ইতিহাস জানতে হলে একটু পিছিয়ে যেতে হবে। পিছিয়ে যেতে হবে অন্তত কয়েক হাজার বছর। ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রাচীন ভাষাগুলোকে বলা হয় প্রাচীন ভাষা আর্য। মূলত মনের ভাব প্রকাশে মাধ্যম ছিল এটি, প্রাচীন আর্যভাষার সঠিক কোনো কাঠামো ছিল। না। পরে এই আর্যভাষা রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় প্রয়োজনে ব্যবহারকালে পন্ডিত এর একটি লিখিত রূপ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও এক হাজার বছর আগে, অর্থাৎ ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। আর্য ভাষা রূপান্তরিত হয় বৈদিক ভাষায়, বেদের শ্লোক তারই নজির বহন করছে। সেটি ছিল উচুঁ গোত্রের মধ্যেই প্রচলিত। সাধারণ মানুষের কাছে বেদের ভাষা বা বৈদিক ভাষা দুর্বোধ্য মনে হতো। তাই তারা দৈনন্দিন জীবনে আঞ্চলিকতার প্রভাবে পাল্টে যাওয়া আর্য ভাষাতেই মনের ভাব প্রকাশ করতো। শতাব্দী পর শতাব্দী কাটতে থাকে আর অাঞ্চলিকতার প্রভাবে মূলভাষাটি চাপা পড়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতভাষায়র উৎপত্তি হয়।










