সীমান্ত হত্যা কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ-ভারত উভয়কেই এগিয়ে আসতে হবে
বাংলাদেশ এবং ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ভৌগলিক অবস্থান, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং অর্থনৈতিক লেনদেন তিনটি কারণেই বাংলাদেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক বিদ্যমান। এমনকি সাংস্কৃতিক মিল-বন্ধনেও রাষ্ট্র দুটির মাঝে ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৪,০৫৩ কিলোমিটার সুদীর্ঘ স্থল সীমান্ত বিশিষ্ট উভয় রাষ্ট্রই মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিরবিচ্ছিন্ন রাখছে। এহেন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান সত্ত্বেও সীমান্ত হত্যার মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রদুটির সুসম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বহিঃশত্রুর হাত থেকে নিজ দেশের সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখা পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশেরই সাংবিধানিক অধিকার। দুর্ভাগ্যবশত, ভারতের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যে ধরনের কঠোর পদ্ধতি অবলম্বন করে তা প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কখনোই কাম্য হতে পারে না।
যদি আমরা লাইন অব কন্ট্রোলের মতো মাত্র ৭৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক সীমান্তের দিকে তাকাই তাহলে একথা স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করা যায় যে পাক-ভারত সীমান্ত কতোটা বিবাদমান একটি অঞ্চল। বর্তমানে কাশ্মীর সংকটের সুবাদে এই অঞ্চলের প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি যেন অবরুদ্ধ। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের অবস্থা ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের মতো মোটেই বিবাদমান কোন জায়গা নয়। অথচ এই সীমান্তটি ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিএসএফের অসহিষ্ণুতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আমরা যদি নিরীহ এবং নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের উপর বিএসএফের সীমান্তে হত্যার পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তবে সহজেই বুঝতে পারবো এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কতটা মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। গত ১১-ই জুন সংসদে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভাষ্যমতে, ২০০৯ থেকে গত দশ বছরে বিএসএফের দ্বারা ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। যদিও মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত দশ বছরে এই নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা ৪১৪ জন। এছাড়াও তাদের হিসাব মতে, ২০০০-২০১৮ সাল পর্যন্ত ১,১৪৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আরো ১,০৭৪ জন আহত হয়েছেন। অপরদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত সীমান্তে ২০ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। উক্ত পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত কতোটা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে।
আজ থেকে প্রায় ঠিক আট বছর আগে ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার ফেলানী খাতুনের কাঁটাতারে ঝুলন্ত মৃতদেহের বিভীষিকাময় ও হৃদয় বিদারক সেই দৃশ্যের কথা আজও আমরা কেউ ভুলিনি। অথচ পনেরো বছর বয়সী ফেলানী খাতুনের হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত বিএসএফ ১৮১ ব্যাটালিয়নের কনেস্টবল অমিয় ঘোষের কোন বিচার তখন হয়নি। ফেলানীর পরিবার নীরবে নিভৃতেই সুবিচার না পাওয়ার কষ্টে আজও ভুগছে। তাদের চোখের জল দেখার যেন কেউ নেই এই স্বাধীন বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তটি অবৈধভাবে ভারতে যাতায়াত, গরু চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র এবং মাদক চোরাচালান এবং জঙ্গি অনুপ্রবেশের মতো কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে ব্যবহৃত হয়। যেহেতু সীমান্তবর্তী এলাকা তাই অনেকের আত্মীয় স্বজন সীমান্তের ওপারে বসবাস করে। তাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যেও অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যায়। উভয় দেশই অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের বিষয়ে জ্ঞাত এবং সবসময়ই দাবি করে যাচ্ছে যে তারা প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণে সবসময় প্রস্তুত। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা, ভারতের বিএসএফ নরম পন্থা অবলম্বনের পরিবর্তে সবসময়ই বিতর্কিত ‘শ্যুট-টু-কিল’ পলিসি অবলম্বন করে যাচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্তে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় গরু চোরাচালানকারী এবং অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী নিরস্ত্র বাংলাদেশিরা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হচ্ছে। অথচ অবৈধ অস্ত্র এবং মাদক চোরাচালানকারীদের বিএসএফের গুলিতে নিহত হবার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না বললেই চলে।
বিএসএফের বিরুদ্ধে অনেক ধরণের মারাত্মক অভিযোগও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, বিএসএফ বাংলাদেশের সীমান্তে অবৈধভাবে প্রবেশ করে বাংলাদেশের সীমান্তে অবস্থানকারীদের জোরপূর্বক ধরে ওপারে গিয়ে শারীরিক অত্যাচার চালায়। অনেক সময় বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে থাকলেও বিএসএফ গুলি চালিয়ে থাকে যা কিনা মানবাধিকারের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনে বিএসএফের প্রধান রজনীকান্ত মিশ্র ‘সীমান্ত হত্যা’ শব্দদুটির বিপক্ষে অবস্থান করেছেন। তিনি সীমান্ত হত্যাকে ‘আনফরচুনেট ডেথ’ তথা ‘দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সীমান্তে নিহত বাংলাদেশিদের মৃত্যু সত্যিই কি দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু ? নাকি টার্গেট কিলিং?
সীমান্ত হত্যা কমিয়ে আনতে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এখনো তেমন কোন অগ্রগতি দেখাতে পারেনি । বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিজিবি শুধুমাত্র পতাকা বৈঠকের মাধ্যমেই তাদের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে থাকে। সরকারকে এই বিষয়টা আরো গুরুত্ব সহকারে আমলে নিতে হবে। সীমান্তে হত্যা প্রতিরোধে সর্বপ্রথম সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারীদের সচেতন করতে হবে যাতে তারা অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার না করে। তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল করতে সরকারকে সুনজর দিতে হবে। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কারণেই সীমান্তের ওপারে যান সীমান্তবর্তী মানুষেরা। দারিদ্র্যের হাত থেকে বাঁচতে জীবনের ঝুঁকি নিতে মানুষ কখনো ভয় পায় না। অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানকারীদের মতো সঙ্গবদ্ধ অপরাধীরা সীমান্তে খুবই সক্রিয়। তাদেরকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। সর্বোপরি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতকে এ বিষয়ে অবগত করতে হবে যেন সীমান্তে নিরীহ এবং নিরস্ত্র বাংলাদেশীরা বিএসএফের গুলিতে নিহত না হয় এবং বিএসএফকে শ্যুট-টু-কিল পলিসির পরিবর্তে নরম পন্থা অবলম্বনের জন্য ভারতকে বোঝাতে হবে। বিপদে আপদে সমসময় প্রতিবেশীই আগে সাহায্যের হাত বাড়ায়। তাই প্রতিবেশীর মর্যাদা যেন ক্ষুন্ন না হয় তাই বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়কেই সচেতন থাকতে হবে।










