কার্যকরী পদক্ষেপ, সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই পারে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে
পরিচ্ছন্ন ও সচেতন থাকি, ডেঙ্গুমুক্ত দেশ গড়ি’ এ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে সোমবার সকালে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ডেঙ্গু সম্পর্কিত গবেষণার ফলাফল হিসেবে কার্যকরী পদক্ষেপ, সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ গবেষণাটি ডক্টর ওয়াজেদ রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং ইন্সটিটিউট, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর এবং ওয়েস্টার্ন সিডনী ইউনিভার্সিটি, স্কুল অব সায়েন্স এ্যান্ড হেলথ, অস্ট্রেলিয়া-এর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ঢাকা শহরের উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন-এর কিছু সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালকে উদ্দেশ্যমূলক নমুনায়ন (Purposive Sampling)-এর ভিত্তিতে নির্ধারণ করে NS1 Positive আক্রান্ত রোগীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করার মাধ্যমে এ গবেষণাটি সম্পাদন করা হয়েছে। ২৪২ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৭৫.৬% পুরুষ ও ২৪.৪% নারী। যাদের মধ্যে শিক্ষার্থী, চাকুরীজীবী, গৃহিণী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ড্রাইভার, গার্মেন্টস কর্মী, শ্রমজীবী ও শিশু রয়েছেন। কোন এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে কোন সুস্থ মানুষকে কামড় দেয়ার মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার হয়ে থাকে। পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড় দেয়ার মাধ্যমে সাধারণ এডিস মশাও আক্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশে অন্যান্য বছরের তুলনায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারি হিসাবে ৪০ জন রোগী এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯ জন ডাক্তারও ছিলেন। ঢাকায় অবস্থানের কারণে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ডেঙ্গু রোগ ও এডিস মশা নিয়ে মানুষের মধ্যে ধারণাগত বিষয়ে জানার অভাব এবং অসচেতনতার কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটেছে বলে অত্র গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়। ৭৩% লোক মনে করেন যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সঠিক ধারনা দেয়া হয় না।
প্লাস্টিক বোতল ও ময়লা আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলা, পানি জমে থাকা, পরিবেশ ও নিজের বাসস্থান অপরিস্কার রাখার কারণে এডিস মশার বিস্তার হয়েছে বলে এ গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়। ৮৭% ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তি যত্রতত্র প্লাস্টিক ও ময়লা আবর্জনা ফেলে থাকেন বলে স্বীকার করেছেন। এছাড়া ৮৩% লোক জানালা দিয়ে প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্য ও ময়লা নিচে ফেলে থাকেন। আক্রান্ত রোগীর ৫৫% এর পর্যবেক্ষণে এটা পরিলক্ষিত হয়েছে যে অফিসে ময়লা আবর্জনা ফেলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ৯২.১% লোক অন্যকে যত্রতত্র ময়লা ফেলতে দেখেছেন। ৯১.৩% লোক রাস্তা-ঘাটে ময়লা দেখলেও সেটা নিজ উদ্যোগে অপসারণ করেন নি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নির্ধারিত সময়ের আগে বর্ষাকালের আগমন, প্রকৃতির প্রতিশোধ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও ব্যক্তিগত অবহেলা ডেঙ্গু রোগ বিস্তারের অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করেন। ৯৯.২% লোক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক যথা সময়ে মশক নিধন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় নি বলে দাবী করেছেন। তাছাড়া ঢাকার আশে পাশের ড্রেন ও খাল নিয়মিত পরিস্কার করা হয় নি বলে অনেকে মনে করেন। ঢাকা শহরে সিটি কর্পোরেশন ব্যতিত খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত। কতিপয় হোটেল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ময়লা আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলছে না বলে প্রতীয়মান হয়। পর্যবেক্ষণকৃত হাসপাতালগুলোর ওয়াশরুম ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিয়মিত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয় না বলে অনেক রোগী অভিযোগ করেছেন। বছরব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি না থাকার কারণে এ রোগ সম্পর্কে মানুষ আশানুরূপ সচেতন ছিলেন না। ঢাকা শহরে বিভিন্ন মেগা-প্রকল্প চলমান ও নিয়মিত ময়লা আবর্জনা পরিস্কার না করা এবং সড়কের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার ও মশার উৎপাত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এ গবেষণায় উঠে এসেছে। অনেকে মশক নিধন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সিটি কর্পোরেশনের ছিটানো ঔষধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার অনেকে ডেঙ্গু রোগ বিস্তারের জন্য সিটি কর্পোরেশন-এর কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহেলাকে দায়ী করেছেন। অনেকে প্রশাসনিক পদক্ষেপকে যথেষ্ট নয় বলে মনে করেছেন।
এ বছর ডেঙ্গু বিস্তারের প্রথম দিকে প্রশাসনিক প্রতিরোধমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিলক্ষিত না হলেও পরবর্তীতে প্রশাসনিক বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতিবাচক বলে প্রতিভাত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এ রোগ বিস্তার কমে আসবে বলে এ গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন ও গণমাধ্যম এ রোগ সম্পর্কে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করার ফলে এ রোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ গবেষণায় অধিকাংশ উত্তরদাতাদের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যক্তিদেরআক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকার কর্তৃক নির্ধারিতহারে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি ও বিনামূল্যে পরীক্ষাকে সবাই প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে মূল্যায়ন করেছেন। পর্যবেক্ষণকৃত হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত রক্ত সংগ্রহের বুথ না থাকা ও বিলম্বে রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগ করেছেন উত্তরদাতাগণ। এ কারণে অনেককেই বাধ্য হয়ে অন্য হাসপাতালে সিবিসি টেস্টসহ অন্যান্য পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এছাড়াও এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে উত্তরদাতাদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অর্থ ও সময় অপচয় এবং মানব সম্পদের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলেও অনেকে মনে করেন। এ রোগের বিস্তার রোধে নি¤œলিখিত কিছু কার্যক্রম যেমন, মশক নিধনে কার্যকরী ঔষধ ছিটানো ও ডেঙ্গু প্রতিষেধক টিকার আবিষ্কার, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুরুষ মশাকে বন্ধ্যাকরণ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন-এর মশক নিধন কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন, পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নতকরণ ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, ঢাকার আশে-পাশের খাল, ডোবা, নালা ও ড্রেন নিয়মিত পরিস্কার ও মশক নিধনকল্পে ঔষধ ছিটানো, প্রাথমিক স্তর থেকেই ডেঙ্গু রোগ সম্পর্কিত বিষয়াদি শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তকরণ, নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও সকলের পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা একান্ত দরকার বলেএ গবেষণার ফলাফলে পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের তথ্য সম্পর্কিত একটি ডাটাবেজ তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করার পাশাপাশি এ ডাটাবেজে সরকার, সিটি কর্পোরেশনসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সকলের অংশগ্রহণ ও প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। ফলস্বরূপ, ভবিষ্যতে এ রোগ কমাতে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি ও প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ ও বিস্তার রোধে এখন থেকে সুদূরপ্রসারি পদক্ষেপ হাতে নেয়া উচিত। বর্তমানে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি ও দ্রুত বিস্তারের কারণে সবার মধ্যে সচেতনা তৈরি হয়েছে, যা অব্যাহত রাখা উচিত। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গু রোগের বিস্তার রোধে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করছেন, যা ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। প্রশাসন ও সরকার দীর্ঘমেয়াদী মশক নিধন কার্যক্রম গ্রহণ করলে এ রোগ প্রতিরোধ ও এডিস মশার বিস্তার কমবে বলে গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়েছে।
এ গবেষণাকর্ম সম্পাদনের সাথে জড়িত ছিলেন, প্রফেসর ডক্টর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, পরিচালক, ডক্টর ওয়াজেদ রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং ইন্সটিটিউট, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর, ডক্টর তানভীর আবির, গবেষণা সহযোগী , স্কুল অব সায়েন্স এ্যান্ড হেলথ, ওয়েস্টার্ন সিডনী ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া, ডক্টর কিংস্লে এগো, সিনিয়র লেকচারার, স্কুল অব সায়েন্স এ্যান্ড হেলথ, ওয়েস্টার্ন সিডনী ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া, আহমেদ খান, রিসার্চ ফেলো, Humanitarian and Development Research Initiative (HADRI, ওয়েস্টার্ন সিডনী ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া এবং Wholistic Integration, Dhaka এর সহযোগী গবেষক মো: হাবিবুর রহমান। এছাড়াও উক্ত সংবাদ সম্মেলনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর –এর ডক্টর ওয়াজেদ রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং ইন্সটিটিউট-এর গবেষকবৃন্দ, বিভিন্ন পর্যায়ের পেশাজীবী, সংবাদকর্মী ও সচেতন নাগরিক উপস্থিত ছিলেন।










