তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব;ঝুঁকিতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও কৃষি

তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব;ঝুঁকিতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও কৃষি

দেশের ইতিহাসে গত ৫২ বছরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩.৮°সে. রেকর্ড করা হয়েছে এবছর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ৪৫°সে. অতিক্রম করতে পারে।

অনুমান অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৪৬°সে. ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডোর গবেষণায় ।

উইমেন’স ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউভিএ) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত একটি মিডিয়া ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি। গবেষণা প্রতিবেদনে  জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবগুলোকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে যে চারটি প্রধান কারণ দায়ী বলে সংগঠনটি বলছে, তার মধ্যে : ১. বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান; ২. জলবায়ুর পরিবর্তন: ৩. জীবাশ্ম জ্বালানি এবং শিল্পকারখানা থেকে কার্বন নির্গমন বৃদ্ধি, যা গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধিতে সহায়তা করে ৪. এল নিনো ইভেন্টের মতো মহাসাগরীয় প্রভাব।

এই কারণগুলি সম্মিলিতভাবে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহকে আরো তীব্র করে তুলেছে। মানুষের পরিবেশ বিরোধী কার্যকলাপের কারণে দ্রুত গতিতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রতিদিন তাপ প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে পৃথিবী দ্রুত শীতল থেকে উষ্ণতর সময়ে রূপান্তরিত হচ্ছে।

প্রকাশিত তথ্যে বলা হচ্ছে বাংলাদেশে এই পরিবর্তনের ফলে প্রায়ই তীব্র তাপপ্রবাহ হচ্ছে, যেখানে দৈনিক সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে শীতকালে।

যদি এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে উষ্ণ সময় মানবজাতির জন্য অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে বলে এতে সতর্ক বার্তা দেয়া হেয়েছে। এতে বলা হয় এই প্রাকৃতিক অগ্রগতিকে আমরা থামাতে পারব না, কিন্তু আমরা বিশ্ব উষ্ণনায়নে অবদান রাখে এমন কার্যকলাপগুলো কমিয়ে আনতে পারবো। একটি কার্যকর ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর প্রভাব হ্রাস করা সম্ভব।

পরামর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি জানায় এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদন ও নগর পরিকল্পনা করা এবং উচ্চ তাপমাত্রার হুমকি থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য স্বাস্থ্য সেবা জোরদার করা। এই তীব্রতর অবস্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং তহবিল জরুরি।

গবেষণাটি বাংলাদেশে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তুলে ধরেছে। এতে উঠে এসেছে ২০০০ সালের শুরু থেকে তাপমাত্রা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা ১০০° ফারেনহাইট (৩৭.৮°সে.) তাপমাত্রা অতিক্রম করেছে। পূর্ববর্তী তথ্যানুসারে, ১৯৯৪, ২০০৪ এবং ২০২৪ সালে চরম তাপপ্রবাহ বাংলাদেশে আঘাত হানে।

এই প্যাটার্নটি থেকে গবেষণা বলছে, এই ধরনের তীব্র তাপপ্রবাহের ঘটনা প্রায় প্রতি দশকে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এই প্রবণতা অনুসরণ করে, অনুমান করা যায় যে, ২০৩৪ সালের দিকে আরেকটি চরম তাপপ্রবাহ ঘটতে পারে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তন আগে থেকে অনুমান করা যায় না, তবে অনুমানটি আমাদের প্রস্তুতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারনা প্রদান করে।

গবেষণায় ১৯৭২ সাল থেকে তাপপ্রবাহের রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সেই সময় প্রায় ২৭° ছিল। বর্তমানে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসের তা ৪৫.১° সে. -এ দাঁড়িয়েছে, যার কারণে এই বছর ১৫ জন মৃত্যুবরণ করে। ২০২৩ সালে তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিদিন ১২০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৩০ সালে এই তাপপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে এবং বয়স্কদের মধ্যে তাপজনিত কারণে ২০৮০ সালের মধ্যে প্রতি ১০০,০০০ জনে ৩০ জনের মৃত্যু হতে পারে।

গবেষণায় আরও জানা গেছে , ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় উচ্চ তাপপ্রবাহের কারণে অনেকেই স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন কিন্তু এই সমস্যা মোকাবেলার বিষয়ে তাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে।

ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাবে কৃষিখাতে ক্ষতিসাধন করছে, যেমন ২০২১ সালের তাপপ্রবাহে ২১০০০ হেক্টরের বেশি ধান নষ্ট হয়েছে।

এসডোর চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব, সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন “এসডো পূর্ববর্তী তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই গবেষণাটি করেছে এবং যদি তাপপ্রবাহের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে তবে ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আমাদের জন্য অসহনীয় হবে।গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর মাধ্যমে তাপপ্রবাহ প্রবণতা কমানো সম্ভব এবং এই লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী নীতি বাস্তবায়ন করা জরুরি।

এসডোর মহাসচিব ডঃ শাহরিয়ার হোসেন বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে যে চরম তাপপ্রবাহ চলছে, যার তাপমাত্রা ইতিমধ্যে ৪০° সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, আমাদের টেকসই ও পরিবেশ-বান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।”

এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, “বাংলাদেশে চলমান তাপপ্রবাহ স্বাস্থ্য, কৃষি এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে এবং আমাদের ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করার জন্য বর্তমান উচ্চ তাপমাত্রাকে কমিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।”

মন্তব্য প্রদান করুন

Share