ছাত্র জনতার ৩৬ জুলাই স্বৈরাচার হাসিনার পলায়নের ১ বছর
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ও জনসম্পৃক্ত আন্দোলনটি সংঘটিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। নজিরবিহীন দমন-পীড়নের কারণে কোটা সংস্কারের দাবি রূপ নিয়েছিল এক দফার আন্দোলনে। সেটি ছিল ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগ’। গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনা।
আওয়ামী লীগের পতন পর্বের শুরুটা হয়েছিল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর সমালোচনা এবং প্রধান বিরোধী দলগুলোর বয়কটের পরও বিতর্কিত নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ৭ জানুয়ারি, ২০২৪ সালে।
দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে প্রায় সব বিরোধী দল ও মতকে কোণঠাসা করতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা। শুধু তা-ই নয়, পরপর প্রশ্নবিদ্ধ তিনটি নির্বাচন করেও তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন। ফলে জনমনে এমন একটি ধারণা বা ‘মিথ’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যে, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে কিছুতেই ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণই যে নিয়ামক শক্তি, এ কথা দেশের মানুষ প্রায় অবিশ্বাস করতে শুরু করেছিল।
দোর্দণ্ড প্রতাপে টানা চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ চালানো সেই শেখ হাসিনাকেই ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে হয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। ৫ আগস্টের সেই চূড়ান্ত দিনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ গণঅভ্যুত্থান সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশকে প্রবলভাবে ধাক্কা দিয়েছে।
‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা আসে ৪ আগস্টঃ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ছিল মূলত ৬ আগস্টে। তবে, ৪ আগস্ট বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে দেওয়া এক বার্তায় তা একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।
নতুন কর্মসূচি নিয়ে ফেসবুকে তিনি লেখেন, “পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এক জরুরি সিদ্ধান্তে আমাদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্ট থেকে পরিবর্তন করে ৫ আগস্ট করা হলো। আগামীকালই (৫ আগস্ট) সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
আসিফ লেখেন, ‘আজ অর্ধশতাধিক ছাত্র-জনতাকে খুন করা হয়েছে। চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার সময় এসে গেছে। বিশেষ করে আশপাশের জেলাগুলো থেকে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিয়ে সবাই ঢাকায় আসবেন এবং যারা পারবেন আজই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। ঢাকায় এসে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা রাজপথগুলোতে অবস্থান নিন।’
সেদিন আসিফের ভাষ্য ছিল, ‘চূড়ান্ত লড়াই, এই ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত স্বাক্ষর রাখার সময় এসে গেছে। ইতিহাসের অংশ হতে ঢাকায় আসুন সকলে। যে যেভাবে পারেন কালকের মধ্যে ঢাকায় চলে আসুন। ছাত্র-জনতা এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাবে।’
কঠোর হতে শুরু করে হাসিনা সরকারঃ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে তিন দিনের (৫, ৬ ও ৭ আগস্ট) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এ অবস্থায় ৫ আগস্ট সকাল থেকে রাজধানীর সড়কগুলো ছিল ফাঁকা। মূল সড়কে মানুষের চলাচল ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগের দিন (৪ আগস্ট) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুই দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। পুলিশের এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার পতনের বিষয়ে পরদিন (৫ আগস্ট) সকাল থেকেই সেনাবাহিনী অবগত ছিল। কিন্তু পুলিশ জানত না বলে সরকারকে রক্ষা করতে তখনো সর্বাত্মকভাবে মাঠে ছিল।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ৪ আগস্ট সকালে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠক হয়। সেখানে সেনা, বিমান, নৌ, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশ ও পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধানেরা ছিলেন। হাসিনা সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বৈঠকে অংশ নেন। তারা ‘মার্চ টু ঢাকা’ প্রতিরোধের জন্য আবার কারফিউ জারি ও তা বলবৎ করার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়, কোনো বিরতি ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য কঠোর কারফিউ চলবে। আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী একটি বিবৃতি দেন। সন্ত্রাসীদের শক্ত হাতে দমন করতে তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান।
৪ আগস্ট সন্ধ্যার পর গণভবনে আরেকটি বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, র্যাব ও আনসার/ভিডিপির প্রধান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও সেনাবাহিনীর কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সেনাপ্রধান ও অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা ঢাকা রক্ষার বিষয়ে আবারও হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছিলেন।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভকারীদের ঢাকার কেন্দ্রস্থলে প্রবেশে বাধা দিতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করার বিষয়ে বৈঠকে ঐকমত্য হয়েছিল। সেনাবাহিনী ও বিজিবি সাঁজোয়া যান ও সেনা মোতায়েন করে ঢাকায় প্রবেশের পথগুলো অবরুদ্ধ করবে, বিক্ষোভকারীদের প্রবেশে বাধা দেবে। অন্যদিকে, পুলিশ ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে নিয়ন্ত্রণ’ করবে।
৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) যা ঘটেছিলঃ
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ঢাকার উদ্দেশে জনস্রোত শুরু হয়। উত্তরা-আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গি থেকে হেঁটেই ছাত্র-জনতার স্রোত সামনে এগিয়ে আসতে থাকে। উত্তরায় আটকাতে না পেরে খিলক্ষেত ও বনানী এলাকায় পুলিশ চেষ্টা করে জনস্রোত ঠেকানোর জন্য। তবে, সেটা সম্ভব হয়নি।
কারণ, ৫ আগস্ট সকালে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা মূলত দাঁড়িয়েছিলেন। আগের রাতে সরকারের করা পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা অর্পিত ভূমিকা পালন করেননি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সাক্ষ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেনা মোতায়েন করা হয়নি। আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, বিজিবি প্রতি ঘণ্টায় বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে প্রায় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার বিক্ষোভকারীকে ঢুকতে দিয়েছে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল।
পরিস্থিতি নিয়ে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ভিডিও ফুটেজে ৫০০ থেকে ৬০০ বিক্ষোভকারীকে সেনাবাহিনীর বাধা ছাড়াই উত্তরা থেকে ঢাকার কেন্দ্রস্থলের দিকে আসতে দেখে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কিছু একটা গড়বড় হচ্ছে। চতুর্থ আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না।
বিজিবি-সেনাবাহিনী বুঝলেও পুলিশ তখনও ছুড়ছিল গুলিঃ
বিক্ষোভকারীদের শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছাতে বাধা দিতে তখনো পুলিশ অনেক জায়গায় গুলি চালাচ্ছিল। পুলিশের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘সেদিন সকাল থেকেই সেনাবাহিনী জানত, শেখ হাসিনার পতন হয়ে গেছে। কিন্তু পুলিশ জানত না। তাই পুলিশ তখনো সরকারকে রক্ষা করতে সর্বাত্মকভাবে মাঠে ছিল।’
রাজধানীর চানখারপুলে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তারা ও অন্য পুলিশ সদস্যরা রাইফেল থেকে প্রাণঘাতী গুলি করে। শাহবাগের দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা করা বিক্ষোভকারীদের থামাতে তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। পুলিশ যাকে পাচ্ছিল তাকে লক্ষ্য করেই গুলি চালায়। সেদিন চানখারপুল এলাকাতেই গুলিতে মারা যান অন্তত সাতজন। ঘটনাটি চানখারপুল গণহত্যা নামে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায়।
গণভবনে ঢুকে পড়েন অসংখ্য মানুষঃ
শেখ হাসিনার পতন হয়েছে— এমন খবরে গণভবনে ঢুকে পড়েন অসংখ্য মানুষ। তারা গণভবনের মাঠে উল্লাস প্রকাশ করেন। এ সময় অনেকের হাতে গণভবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস দেখা যায়।









