বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইসলামী নেতার মৃত্যুদন্ড বহাল
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট || টুডে টাইমস
বাংলাদেশের সরকার বিরোধী সর্বোচ্চ ইসলামী নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
মাওলানা নিজামী একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, স্বৈরাচার আয়ুব খান বিরোধী ছাত্র নেতা, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী এবং দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির তথা সর্বোচ্চ নেতা।
পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিচারের জন্য প্রণীত আইন ৩৬ বছর পর পাল্টে দিয়ে বেসামরিক নাগরিক মাওলানা নিজামীকে দেওয়া মানবাধিকার হরণমূলক শাস্তি ফাঁসি হ্রাস করা হবে বলে অনেকে প্রত্যাশা করেছিলেন।
কিন্তু বিরোধী দলীয় অন্য নেতাদের মতোই মাওলানা নিজামীকেও চূড়ান্তে রায়ে ফাঁসি দেওয়ার কথা বললেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
এর আগে জামায়াতের তিন নেতা আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করলেও সুপ্রিম কোর্ট তা গ্রাহ্য করেনি।
আজ বুধবার সকালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ মাওলানা নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহালের রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন ও বিচারকরা সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত। ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে অনেকে পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেয়েছেন। সাক্ষী ও প্রসিকিউটরদের কেউ কেউ সরকারি দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন।
বিরোধী দলীয় নেতাদের মানবতাবিরোধী বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গ সম্পৃক্ত আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে সম্প্রতি ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির (ঘাদানিক) কর্মীদের সঙ্গে রাস্তায় মিছিল-মিটিং করতে দেখা গেছে।
প্রায় কুড়ি বছর আগে ঘাদানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলকভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালত বসিয়ে যাদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছিল, তাদেরই ফাঁসি হচ্ছে। ঘাদানিকের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের ফাঁসি কার্যকরের পর বিচারপতিকে আবার ঘাদানিকের ব্যানারে বিরোধী নেতাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ঘোষিত মাওলানা নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহালের ঘটনা ঘটলো।
গত ৮ ডিসেম্বর এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ তাঁদের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করলে আদালত রায়ের জন্য আজ (৬ জানুয়ারি) দিন ধার্য করে দিয়েছিলেন।
নিজামীর মামলাটির মাধ্যমে সর্বোচ্চ আদালতে ষষ্ঠ আপিল মামলার চূড়ান্ত রায় হলো। ট্রাইব্যুনাল থেকে আপিল বিভাগে আসা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর মধ্যে এর আগে পাঁচজনের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে।
২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাবনায় হত্যা, ধর্ষণ ও বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন জামায়াত নেতা। এ মামলায় গত ৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ তাদের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেছিল।
আজ সকাল ৯টা ৩ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন আদালত। ৯টা ১০ মিনিটের মধ্যেই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা আপিল বিভাগ।
নিজামীর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং হত্যা-গণহত্যাসহ সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) মোট ১৬টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে আটটি, অর্থাৎ ১, ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৮ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয় ট্রাইব্যুনালের রায়ে।
প্রমাণিত চারটি, অর্থাৎ সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়িসহ দুটি গ্রামে প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে হত্যা ও প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ (২ নম্বর অভিযোগ), করমজা গ্রামে ১০ জনকে গণহত্যা, একজনকে ধর্ষণসহ বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ (৪ নম্বর অভিযোগ), ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে গণহত্যা (৬ নম্বর অভিযোগ) এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (১৬ নম্বর অভিযোগ) দায়ে নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর মধ্যে আপিল বিভাগ আজ করমজা গ্রামে ১০ জনকে গণহত্যা, একজনকে ধর্ষণসহ বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের (৪ নম্বর অভিযোগ) দায় থেকে খালাস দেয়। বাকি তিনটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন।
পাশাপাশি পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিন হত্যা (১ নম্বর অভিযোগ), মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্রের (৩ নম্বর অভিযোগ) দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিজামীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আপিল বিভাগ এ দুটি অভিযোগ থেকেও তাঁকে খালাস দিয়েছেন।
তবে আপিল বিভাগ বৃশালিখা গ্রামের সোহরাব আলী হত্যা (৭ নম্বর অভিযোগ) এবং রুমী, বদি, জালালসহ সাত গেরিলা যোদ্ধা হত্যার প্ররোচনার (৮ নম্বর অভিযোগ) দায়ে নিজামীকে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন।
সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখায় নিয়ম অনুযায়ী, সুপ্রিমকোর্ট এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর তা ট্রাইব্যুনালে পাঠাবে। সেটি হাতে পেলে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবে ট্রাইব্যুনাল। সেই মৃত্যু পরোয়ানা ফাঁসির আসামিকে পড়ে শোনাবে কারা কর্তৃপক্ষ।
পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করতে পারবে আসামিপক্ষ। রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তি হয়ে গেলে এবং তাতে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে আসামিকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে। তিনি স্বজনদের সঙ্গে দেখাও করতে পারবেন।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টি ফয়সালা হয়ে গেলে সরকার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবে।










